স্থানীয় সরকার

জেলা পরিষদে বাজেট এবং পরিকল্পনা কাঠামো কেন অপরিহার্য?

যুক্তিসংগতভাবে স্থানীয় সরকারের ব্যয়ের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন নিশ্চিত করার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এবং জনবান্ধব পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে জেলা পরিষদের বাজেট প্রস্তুত করা উচিত।

যুক্তিসংগতভাবে স্থানীয় সরকারের ব্যয়ের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন নিশ্চিত করার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এবং জনবান্ধব পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে জেলা পরিষদের বাজেট প্রস্তুত করা উচিত। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৪-এর প্রতিবেদনে সংস্কারের প্রায়োগিক পরামর্শসহ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরেছে। জেলা পর্যায়ের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি রুলস, আয়ন-ব্যয়ন ক্ষমতা, প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে নতুন বিধি প্রণয়ন প্রয়োজন হতে পারে। তাছাড়া জেলায় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে যেসব দপ্তর-অধিদপ্তর রয়েছে তারা তাদের নিজ নিজ অধিদপ্তর ও সংস্থার অধীনে কাজ করলেও জেলা পরিষদের কাছে তাদের বিভাগীয় প্রকল্প ও পরিকল্পনা জমা করবেন এবং ওইসব প্রকল্প ও পরিকল্পনা জেলা পর্যায়ে জেলা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গণ্য হবে।

তাই জেলা পরিষদ এসব কার্যক্রম বা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, কাজের গুণমান, অগ্রগতি ইত্যাদি পর্যালোচনা করার অধিকারী হবে এবং আন্তঃসংস্থা পরিকল্পনার সমন্বয় করবে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, সড়ক, পয়োনিষ্কাশন, বৃহৎ নদী, খাল বা অন্যান্য পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ইত্যাদি জাতীয় পরিকল্পনা বা প্রকল্পগুলো জেলা পর্যায়ে জেলা পরিকল্পনা বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। জেলা পরিকল্পনা বই প্রণয়ন, এ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত সব প্রকল্প বা প্রকল্পাংশ পরিবীক্ষণ ও প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে জেলা পরিষদ হস্তান্তরিত ও সংরক্ষিত নির্বিশেষে সব উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করার অধিকারী হবে। কোনো বিশেষ বিভাগের কর্মকর্তারা জেলা পরিষদের সঙ্গে এ ব্যাপারে অসহযোগিতা করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

জেলা পর্যায়ে একটি সার্বিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা ব্যবস্থা বা পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হলে জেলা পর্যায়ে সব উন্নয়ন কার্যক্রমকে দৃশ্যমান করা সম্ভব এবং জেলা পর্যায়ে কর্মরত সব বিভাগ ও দপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়ন করার বহুল আলোচিত বিষয়টি একটি বাস্তব রূপ পেতে পারে। পাঁচটি প্রধান উৎস কেন্দ্র থেকে জেলা পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ সমন্বিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, জেলা পরিষদের নিজস্ব উন্নয়ন ও সেবা পরিকল্পনা; ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, পৌর করপোরেশন এবং উপজেলা পরিষদগুলোর উন্নয়ন ও সেবা পরিকল্পনাগুলো; জেলায় কর্মরত বিভিন্ন সরকারি বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর নিজস্ব জেলাভিত্তিক কার্যক্রম এবং বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট বা জাতীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রকল্পের বিভাজ্য অংশগুলো; জেলায় কর্মরত সব এনজিওর বিভিন্ন কার্যক্রম এবং জেলার অভ্যন্তরে ব্যক্তি বা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য উদ্যোগ এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম।

সরকার জাতীয়ভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি পরিপত্রের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ বিভাগীয় প্রকল্প ও পরিকল্পনাগুলো জেলা পরিষদে পেশ করার নির্দেশ দেয়া যেতে পারে। একই নির্দেশে পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে জেলা পরিষদের কী ভূমিকা হবে সেটিও জানিয়ে দিতে পারে। জেলা পরিকল্পনার প্রকৃত সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস করতে হবে। সমন্বয়ের সুবিধার্থে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের সংশোধন, রিশিডিউলিং, আকার ও আয়তন কমানো-বাড়ানো ইত্যাদির প্রয়োজন হতে পারে। তাই জেলা পরিষদ নিজস্ব একটি পরিকল্পনা কোষ গঠন করে জেলায় কর্মরত বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ কর্মীদের মাধ্যমে এ কাজ করতে পারে।

জেলা পরিষদ পরিকল্পনা সমন্বয়ের জন্য একটি পরিকল্পনা কোষ গঠন করবে। জেলা পরিষদ প্রধান নির্বাহী, জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, জেলা পরিকল্পনাবিদ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রধান পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তরের একই পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা—এ পাঁচজন কর্মকর্তা মিলে পরিকল্পনা কোষ গঠন হবে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী হবেন এ কোষের প্রধান এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হবেন সদস্য সচিব। পরিকল্পনা কোষকে কার্যকর করার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তর থেকে দুজন কর্মকর্তাকে জেলা পর্যায়ে প্রেষণে নিয়োগ দিতে হবে।

জেলা পরিকল্পনা কোষ সব খাতভিত্তিক দল-উপদলগুলো গঠন ও দলগুলোকে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন সরবরাহ করে তাদের মাধ্যমে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি এবং তা খসড়া পরিকল্পন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত করবে। প্রতি আর্থিক বছর শুরুর তিন মাস আগে থেকে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুনের মধ্যে দলভিত্তিক খসড়া পরিকল্পনা তৈরি হয়ে যাবে। জুনের শেষ সপ্তাহে সব বিশেষজ্ঞ দল, ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের সব সদস্য, সংসদ সদস্যরা এবং জেলার বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর উপস্থিতিতে জেলা পরিকল্পনার খসড়া আলোচনার জন্য জেলা পরিষদ একটি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করবে। জুলাই-আগস্টে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্তভাবে বাজেট প্রণীত হওয়ার পর জেলা পরিকল্পনা পরিষদের একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন চূড়ান্ত করা হবে। এ অধিবেশনে জেলার সব জাতীয় সংসদ সদস্যও অংশগ্রহণ করবেন।

যেসব বিষয় ও বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়নি, সেসব বিভাগ বা দপ্তর সরকারের সংরক্ষিত বিষয় বলে গণ্য হবে। তবে সংরক্ষিত বিষয়গুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনা সমন্বয়, কাজকর্ম পর্যালোচনা ইত্যাদির জন্য সরকার একটি সাধারণ বিধি প্রণয়ন করবে। এ বিধি অনুসারে সব সংরক্ষিত (Retained Sublect) বিষয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা জেলা পরিষদের সঙ্গে তাদের সব কাজকর্মের সমন্বয় সাধন করবেন। জেলা পরিষদ প্রতি বছর অক্টোবরের মধ্যে জেলা পরিকল্পনা বই প্রকাশ করবে। এ বই জেলা পরিকল্পনার অংশীদার সব সংস্থা ও পরিষদের জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। কোনো সংস্থা বা পরিষদ পরিকল্পনা বইয়ের বাইরে কোনো প্রকল্প নতুনভাবে গ্রহণ করতে গেলে তার জন্য জেলা পরিষদের অনুমতি নিতে হবে বা জেলা পরিষদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে তা পাস করাতে হবে। কোনো দুর্যোগ বা জরুরি অবস্থা মোকাবেলার উদ্দেশ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন ইত্যাদির জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতের জেলা পরিকল্পনাকে অনুসরণ করতে হবে।

পরিকল্পনা-বহির্ভূতভাবে ওপর থেকে ব্যক্তি বা সংগঠনের ওপর চাপিয়ে দেয়া কার্যক্রম বাস্তবায়ন করাকে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত করে সব কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত জেলা পরিকল্পনার আওতাভুক্ত করা হলে সম্পদের সুষম ব্যবহার সম্ভব হবে। তবে জেলা পরিকল্পনা হবে নমনীয় প্রকৃতির। প্রয়োজনবোধে বছরের অন্য সময়ও নতুন প্রকল্প পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পেশ করা যাবে। জেলা পর্যায়ে সরকারি যেসব বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত সেগুলোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা জেলা পরিষদে ন্যস্ত হবে। সংরক্ষিত বিষয়গুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিজ নিজ দপ্তরের মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও তাদের উন্নয়ন ও সেবা প্রকল্পগুলো জেলা পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন হবে। জেলা পরিষদ সরকারের যেকোনো বিভাগের কার্যক্রম তদারকি ও পর্যালোচনা করতে পারবে।

জেলা পরিষদের কার্যক্রমগুলো পরিচালনার জন্য জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিধি; জেলা পরিষদ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বিধি ও ম্যানুয়াল; জেলা পরিষদ শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল; জেলা পরিষদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল; জেলা পরিষদ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল (যা সড়ক, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পানিসম্পদ কাঠামো, পানি সরবরাহ, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশনসহ সব অবকাঠামো সম্পর্কিত বিধি জেলা পরিষদকে প্রণয়ন করতে হবে। জেলা পরিষদের নতুন ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিধি ও ম্যানুয়াল তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা যথাযথ পরিবর্তন। সমন্বিত জেলা পরিকল্পনা বই তৈরির যাবতীয় প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি বর্ণনাপূর্বক একটি জেলা পরিকল্পনা ম্যানুয়াল তৈরি করা।

বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বিভাগের মধ্যে কর্মসূচি বা কার্যক্রমের দ্বৈধতা চিহ্নিত করে জেলা পর্যায়ে সরকারি দপ্তর হ্রাস করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে পেশ করা। জেলা পরিষদের পরিকল্পনা কোষ গঠন করে পরিকল্পনা কাঠামোকে শক্তিশালীকরণের জন্য প্রতিটি জেলা পরিষদে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে একজন সহকারী প্রধান পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং আইএমএডি থেকে উপপরিচালক পদমর্যাদার একজন মোট দুজন কর্মকর্তা জেলা পরিষদে প্রেষণে নিয়োগ করতে হবে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী, জেলার ডেপুটি বা জেলা কমিশনার, সব জাতীয় সংসদ পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র, সব উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পাঁচজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের সদস্য হবেন। তারা জেলা পরিকল্পনার ওপর একটি অধিবেশনে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হবেন পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী তার সদস্য সচিব। এ কর্তৃপক্ষ জেলার পরিকল্পনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন জেলা পরিষদকে বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথাযথভাবে প্রায়োগিক ও কার্যকরী সংস্কারের প্রস্তাব করেছে।

ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; অতিথি অধ্যাপক (ভিজিটিং প্রফেসর), অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড এবং সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন

আরও